,



ইতির জীবন-শেখ ইলোরা হোসেন

Spread the love

আমি ইতি, ভাই-বোন, বাবা-মা সবার খুব আদরের।  আপুর কাছে শুনলাম আমি নাকি ছোট বেলায় খুব শান্ত ছিলাম তাই আদরেরও ছিলাম বেশ।

আজ আমার জন্মদিন। আমি যখন জন্ম নিলাম তখন সবাই খুব খুশি হয়েছিলো। ভালবেসে আমার নাম দিল ইতি যার অর্থ শেষ।

সবার খুব  আদর ভালবাসায় একটু একটু করে বড় হতে লাগলাম। আমি নাকি খুব হাসিখুশী আর শান্ত  স্বভাবের ছিলাম, একটু বোকাও ছিলাম অতি সহযেই সব মানুষকে বিশ্বাস করতাম

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন এক চাচার (দুঃসম্পর্কের) চোখে পড়লাম। কেমন যেন এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাঁকিয়ে থাকতো! চোখে চোখ পড়লেই একটা কেমন জানি হাসি দিত। আমার ভাল লাগতো না। একদিন বাসায় তেমন কেউ ছিল না। আমি বসে পড়ছিলাম, হঠাৎ তিনি বাসায় এসে আমার কাছাকাছি এসে বসলো-

বাসায় কেউ নেই? সবাই কোথায়?

বললাম বাইরে গেছে। তখন তিনি আরো কাছে এসে এগিয়ে বসলো। এবং এটা সেটা জিজ্ঞাস করার ভিতর দিয়ে কেমন যেন সব আজব কিছু কথা বলছিলো। কথার মাঝে হঠাৎ করে বললো, তুমি না অনেক সুন্দর।

আমি কিন্তু সুন্দরী না, দেখতে কালো। উনি  কেন বললো জানিনা। আচ্ছা তুমি কী পড়ছো? জবাবে আমি বললাম দেখতে পাচ্ছেন না? হঠাৎ সে আমার পিঠে হাত দিয়ে আদর করতে লাগলো। তার আদরে নষ্টামি ছিলো। খুব বিরক্ত লাগছিল মনে হচ্ছিল একটা চর দিতে পারতাম? কিন্তু সম্ভব না, তাই মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলাম এরই মধ্যে ভাইয়া বাসায় চলে এলো । আমি যেন হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। তারপর সে চলে গেল। সে প্রায় বাসায় আসতো, চাচা হিসেবে আদর করতো। কিন্তু তার আদর ছিলো বিষের মতো। না পেরে আপুকে বললাম। আপু কী করেছে জানিনা কিন্তু তারপর থেকে সে আর আসতো না। আপু আর মা বলতো কোন ছেলেকে তোর শরীর স্পর্শ করতে দিবি না। কথাটা আমার মনের ভেতর গেঁথে দিলাম।

 

আমার মনে অনেক আশা ছিল, ভালো মানুষ হবো, জীবনে কিছু করে দেখাবো। অনেক স্বপ্ন দেখতাম।সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন মনের ভিতর  যত্ন করে রাখতাম।

 

আমি অনেক শান্ত ছিলাম। ফ্যামিলি ছাড়া বাইরের কারো সাথে তেমন কথা বলতাম না। আমাদের পরিবারটা অনেক হাসিখুশি ছিলো। আমার ছোটবেলায় স্কুলের বান্ধবীরা ছিলো আমার খেলার সাথী। স্কুল জীবনটা অনেক মজার ছিল খুব হাসি মজা করতাম। থেলাধুলা করতাম। ভালোই কাটছিল সময়…

আমি যখন দশম শ্রেনীতে পড়ি, তখন একটা ছেলে আমাকে প্রপোজ করে। আমি তো থ…! কচি মন, দেখতে ভালো না তাই মনের মধ্যে একটু শিহরন লাগলো। ভাবলাম আমি কালো সবাই তো সুন্দরী খোঁজে। তার প্রপোজে কিছুটা অবাক হলাম। কিন্তু রাজি হলাম না, খুব ভয় হচ্ছিল।

 

আজ আমার বোনের বিয়ে। শুভ বিবাহ সেই উপলক্ষে সামান্য সাজুগুজু করলাম। বন্ধুরা বললো তোকে তো পরির মতো লাগছে। আমি বললাম,কি কালো পরি, সবাই হাসলো। ওরা বললো দেখ তুই নিজেকে যেমন ভাবিস তুই তেমন না। তোর আলাদা সৌন্দর্য আছে। হুম হয়েছে তোদের কোন কমতি নেই তাই বলিস।

 

বাবা আপুর বিয়েটা অনেক ধুমধাম করে দিয়েছেন। সবাই খুব আনন্দিত। বাবা মার মুখে স্বস্থির হাসি। এরই মধ্যে এক অবাক ব্যাপার আমার চোখে পরলো। যে আমাকে প্রাপোজ করেছিলো। সে আমার বোনের বিয়েতে। কিন্তু পরে জানলাম সে আমার ছোট ভাইয়ার বন্ধু।

 

যথা সময় বরযাত্রী এলো। রিতি অনুযায়ি গেট ধরলাম। অবশেষে কিছু উপহারও পেলাম। (টাকা)

স্কুল জীবনে এতোগুলি টাকা বেশ আনন্দ পেলাম। বন্টন করার পরও হাজার টাকা ছিল আমার। আমাদের দুলা ভাই মানুষটা বেশ মজার ছিলো।

আমাকে বলে শালি মানে কি জানো? আমি বললাম না। শালি হলো আধা ঘরওয়ালী। আমিও বেশ জবাবে পটু ছিলাম। বললাম তা হবে না। আধা বাদ দিন শুধু ঘরওয়ালী নিয়েই থাকেন।

আপুর বিদায়ের সময় হলো। আপু খুব কাঁদছে সাথে আমরাও। চোখ মুছে আপুর কাছে গিয়ে বললাম এতো কাঁদছিস কেন.? কেউ কী মারা গেছে? না কেউ তোকে কিডন্যাপ করেছে? সবাই হেসে দিলো। আপু চলে গেলো। আমাদের একটা একটা পাতা ঝরিয়ে অবশেষে ঘরটা স্বস্থি পেল।

আপুর শশুর বাড়ির সবাই আপুকে খুব ভালোবাসে। আসলে আপু দেখতেও বেশ সুন্দরী আর অনেক মিশুক,তাছারা রান্নাও করে বেশ। ওদের বাসার সবাই আমাকেও অনেক ভালোবাসে, স্নেহ করে। আর সেই স্নেহের সুবাদে আমার প্রায় যাওয়া হতো, কখনো কখনো রাতেও থাকতাম। ওর একটা ননদ ছিল তার সাথে ভালোই আড্ডা জমে উঠতো। ভালই কাটছিল দিনগুলি। ভাইয়া দুষ্টমি করে আমাকে ডাকতো কই আমার হাফ বউ কোথায়? আমি মজা পেলেও রাগের ভাব করতাম। ভাইয়া হাসতো। ভাইয়া আসলেই অনেক ভাল। আপুর সব রকম খেয়াল রাখে। শাশুড়িও আদর করে ডাকে মা ও বউমা। আপুকে সুখি দেখে মনটা ভরে যেত…

আট মাস পর খুশির খবর শুনলাম, আমার আপু মা হতে চলেছে। সেই সুবাদে আমি খালা। বাবা মা’র আদেশে আপুকে দেখা শুনার গুরু দ্বায়িত্ব পড়লো আমার কাঁধে। যদিও সাত দিনের জন্য।

 

প্রথম দিন খুব মজা করে দিন রাত কাটলো। রাতে আমি আর পুতুল (আপুর ননদ) ঘুমাতে গেলাম। ঐ বাসায় গেলে সবসময় পুতুলের সাথেই ঘুমাতাম। দুজন মিলে গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি।

 

হঠাৎ মধ্য রাতে আচমকা একটা স্পর্শে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে দেখি হায়নার মতো দৃষ্টিতে  আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে। আর হাতটা আমার বুকের উপর। ভয়ে উঠে বসলাম। চিৎকার দিলাম না, কারন পাশেই পুতুল নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। তাছারও আরেকটা কারন হচ্ছে  ওই হায়নাটা হচ্ছে পুতুলের মেঝ ভাই। আমি ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। কিছুই ভাবতে পারছি না। কি হলো এটা আমার সাথে! যে আদর করে সবসময় ইতি মনি, ইতি মনি করে ডাকতো। সেই আজ হায়নার রূপ নিল! আমার মাথা কোন কাজ করছে না। মনে হচ্ছে এক্ষুনি চলে যাই। কিন্তু এতো রাতে কিভাবে যাবো। মনে মনে আল্লাহ কে স্মরন করতে লাগলাম। ঝিম মেরে শুয়ে থাকলাম সকালের অপেক্ষায়। ভাবলাম বাড়ির সকলে উঠলে তারপর উঠবো, যেন ওই হায়নাটার সামনে না পড়ি।

 

সকালে আপু রুমে ঢুকলো, কিরে আর কত ঘুমাবি? পুতুল তো উঠে গেছে। আপু আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো, ওঠ সোনা। উঠেই আপুকে জরিয়ে ধরে কেঁদে উঠলাম। আপু বললো কিরে কি হয়েছে পাগলি? আমি কিছু না বলে কাঁদতে থাকলাম। আপু আদর করে বললো কি হয়েছে বলবি তো? মনে মনে ভাবলাম কি করে বলি তোকে হায়না এসে থাবা মেরেছে আমাকে। নিজেকে সামলে বললাম আপু অনেক খারাপ স্বপ্ন দেখেছি,কেমন যেন ভয় লাগছে। আপু আদর করে বললো, ধুর পাগলি স্বপ্ন কখনো সত্যি হয়না, উঠে ফ্রেশ হ নাস্তা করবি। আপু চোখ মুছে দিয়ে টেনে উঠালো আমাকে। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি পারছি না। বেসিনের সামনে দাঁত ব্রাশ করছি, হঠাৎ আবার চমকে উঠলাম। হায়নাটা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলছে ইতি মনি রাতে কেমন ঘুম হলো। আমি বাক রুদ্ধ হয়ে গেলাম। ব্রাশ ফেলে দিয়ে দৌড়ে আপুর রুমে গেলাম। নিজেকে স্বাভাবিক করে আপুকে বললাম, আপু আমি এখনো চলে যাবো। আজ প্রাকটিক্যাল জমা দেয়ার শেষ দিন, না গেলেই নয়। জমা দিয়েই আসবো আপু , আপু রাজি হলো। বললো এতো দূর কী করে যাবি? সজিবকে নিয়ে যা। ও তোকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। মনে মনে ভাবলাম হায়নার হাতে তুলে দিচ্ছ সেতো আমাকে চুষে খাবে। তুমিতো জানোনা ওতো মানুষ না। আরে লাগবে না, আমি একাই যেতে পারবো। আপুর সাথে সাথে গলা জুড়ে দিলাম সময় নষ্ট করার কোন কারন হয়না।

অবশেষে বের হলাম, সারা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে বাসায় এসেই মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে দিলাম । মা খুব শক্ত করে ধরলো আমাকে। পরে সবকিছু বললাম মাকে, মার চোখ ভিজে আসছে। মা আমার মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে আদর করতে লাগলো। মা কিছুই বলতে পারলো না। মাকে ওয়াদা করালাম যেন কাউকে না বলে। এরপর থেকেই আপুর বাসায় একা আর কোনদিন যাইনি।

 

আজ আমার এস এস সি রেজাল্ট দিবে। ওহো কীযে টেনশন! ভয়ে ভয়ে আল্লাহর নাম জপতে জপতে গেলাম স্কুলে। মনের আশা পূরন হলো, রেজাল্ট ভালই হলো। মা বাবা ভাইয়া সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরলো,ভাইয়া নাচা শুরু করে দিল, ওরে আমার বাবুনীটা এতো ভাল রেজাল্ট করলো। আপু ভাইয়া আর পুতুল এলো অনেক চকলেট আর মিষ্টি নিয়ে। সবাই খুব মজা করছে।

এখন আমি ফার্ষ্ট ইয়ারে কিছু স্কুল বন্ধু আর কিছু নতুন বন্ধু ভালোই কাটছে,এই নতুন পরিবেশে। বাবা একটা কোচিং এ ভর্তি করিয়ে দিল ও হ্যা এতোদিন আমি ভাইয়ার কাছেই পড়তাম, তাই শিক্ষকের প্রয়োজন হয়নি। কোচিং এ আমার বন্ধুরাও ছিল। ভালই লাগতো ইয়াং ইয়াং ছেলেরা পড়ায়। ছেলে মেয়ে একসাথে পড়তাম। সবার সাথে বেশ সক্ষতা গড়ে উঠেছিল।

আজ সেকেন্ড ইয়ারের একটা ছেলে আমাকে আমার বান্ধুবীর মাধ্যমে প্রেমের প্রস্তাব পাঠালো। বললাম ধুর এসব প্রেম আমাকে দিয়ে হবে না। কিন্তু ওরা সব চেপে ধরলো। কণা বললো ওরে রাজী হয়ে যা। দেখতে খুব সুন্দর, আমাকে বললে তো আমি সাথে সাথে হ্যা বলে গলায় ঝুলে পড়তাম। যা তুই ঝুলে পর আমি পারমিশন দিচ্ছি। হু আমাকেও তো দেখেছে আমাকে তো প্রস্তাব  দেয়নি, দিয়েছে তোকে। তার মানে আমি যেয়ে বানরের মতো গলায় ঝুলবো? আরে! বানরের মতো কেন তোর মতো ঝুলবি। প্রতিদিন কোচিং এ এসে একই কথা শুনতে শুনতে শেষ মেশ ঝুললাম। আসলেই দেখতে অনেক সুন্দর। শুরু হলো প্রথম প্রেম কাহিনী। আমাদের মাঝে কথা কম হতো। চলতো চিঠির আদান প্রদান। কিন্তু আমার একটা শর্ত ছিল দেখা হবে কথা হবে বাট আমাকে স্পর্শ করবা না। সে রাজি ছিল। ওকে দেখলে খুব ভালো লাগতো। কথা বলতে ইচ্ছে করতো। কাছে এলেই মনটা আমার নেচে উঠতো। প্রায়ই আমার কলেজের সামনে আসতো। ফাঁকা যায়গায় বসে দুজনে গল্প করতাম কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করতাম ও সবসময় আমার ঠোটের দিকে তাঁকিয়ে থাকতো। মনে হতো এখনি জাপটে ধরে খাবে। আবার কথার ছলে আমাকে স্পর্শ করতো করেই বলতো স্যরি। স্যরি বললে আর কি বলার থাকে…

 

একদিন কোচিং থেকে বের হতে রাত হয়ে গেল ও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল বললো চলো তোমাকে পৌছে দেই। বললাম রিক্সা না হেটে যেতে হবে, বলল আচ্ছা মহারানী আপনি যা আদেশ করবেন। চললাম দুজন। চলতে চলতে অন্ধকার একটা জায়গায় এসে আমাকে চেপে ধরে গালে কিস করলো। আমি ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রেগে বললাম তুমি যাও আমাকে আমার মতো যেতে দাও।

বাসায় এসে খুব রাগ হলো ২ দিন কলেজে কোচিং গেলাম না। বন্ধুদের মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম আমার পক্ষে সম্ভব না রিলেশন রাখা। ও অনেক ট্রাই করলো রিলেশনটা রাখার। চিঠি পাঠালো কিন্তু কাজ হলো না। কারন, ভালো লাগতো ঠিকই কিন্তু মনে হতো ভালোবাসাটা শক্ত ছিল না তাই না বলতে পেরেছি।

বাসায় বসে বসে ভাবতাম আমি কি পুরুষের ভোগের পাত্রী আমার সাথে কেন এমন হয়। ভালোবাসা মানে কি জড়িয়ে ধরতে হবে নিজের সর্বস্ব উজার করে দিতে হবে! এ কেমন ভালবাসা! স্বার্থহীন ভালবাসা হয়না? তবে কি যারা প্রেম করে সবাই এমন?

কোচিং বাদ দিলাম বাসায় টিচার রেখে পড়তাম আর ভাইয়া তো আছেই।

 

H.S.C এক্সাম শুরু হলো। এক্সাম ভালই হচ্ছে মনটাও ভাল। অবশেষে শেষ হলো। এবার রেজাল্টের অপেক্ষা  হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাঃ বললো স্টোর্ক করেছে। ১৫ দিনও গেল না বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বাসাটা খালি খালি লাগে। আমরা ভাই বোন নিজেদের সামলে নিলাম। কিন্তু মা পারলো না। মা ধিরে ধিরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মা বাবার মধ্যে খুব মিল ছিল কেউ কাউকে ছারা খেতো না। যা করতো দুজনে আলোচনা করে করতো। দুজনের প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল।

 

মা আপুকে খুব জোর করলো আমি বেঁচে থাকতে ইতির বিয়েটা দিয়ে দে। আপু ছেলে দেখা শুরু করলো। এদিকে আমার এইচ.এস.সি রেজাল্টও ভাল হলো। ইংলিশে অনার্স ভর্তি হলাম।

এদিকে ভাইয়া আপু  কে বললো, সে ভালোবাসে একজনকেই তাকেই বিয়ে করবে। আপু ভাইয়া সব খবর নিয়ে তাদের বাসায় প্রস্তাব পাঠালো। তারাও রাজি হলো, খুব সক্ষতার মাঝে তাদের বিয়ে হলো। ভাবিটা অনেক সুন্দর আমার আর মায়ের দুজনের একটা সঙ্গি হলো। ভাগ্যিস বাবা একটা বাড়ি করেছিল তা না হলে ভাইয়ার এতো বেতনে সংসার চলতো না। যাই হোক ভালই কাটছে আমাদের জীবন। কলেজ থেকে ফিরেই দেখি ছেলেপক্ষ এসেছে আমাকে দেখতে। অপ্রস্তুত ছিলাম কিন্তু নিজেকে সামলে নিলাম। আপু সাঁজতে  বললো , বললাম সাঁজতে পারবো না। পচ্ছন্দ হলে এমনি হবে। শাড়িও পড়লাম না। এমনিতেই গেলাম। কি আছে আমার মধ্যে আল্লাহ জানেন, দেখেই ছেলের মার খুব পচ্ছন্দ হলো। আমাকে আংটি পড়িয়ে দিল তারিখ ঠিক করে ফেললো। ছেলে আর আমাকে একা গল্প করার পরিবেশ করে দিল। আহা কি রোমান্টিক পরিবেশ! মনে মনে ভাবছি আসো আমাকে জড়িয়ে ধরো, আনমনে আবোল তাবল ভাবছি। ছেলেটির কথায় ফিরে এলাম,বেশ সুন্দর করে কথা বলে। দেখতেও ভাল কিন্তু আমার কালো ভুতুরে মুখ দেখে কেন পচ্ছন্দ করলো? তিনি বললেন শুধু আমি বলবো আপনি কিছু বলবেন না? হুম একটা কথা জানার আছে আমি কালো সব ছেলে সুন্দরী মেয়ে খুঁজে তবে আমাকে কেন পচ্ছন্দ করলেন? দেখ তুমি এতোটা কালো না আর তোমার চোখে অনেক মায়া আছে। সেই মায়া আমাকে তোমার কাছে নিয়েছে। বাহ আপনি থেকে একলাফে তুমি এরপর তুই বলে কি না কে জানে? যাক বাঁচা গেল সবাই চলে আসলো একবস্থায় বিদায় জানিয়ে চলে গেল।

রিতি অনুযায়ী বিয়ের কেনাকাটা শুরু হলো। আমাকেও সঙ্গে নিলো। অনেক কিছু কেনা শেষ এবার শাড়ির দোকানে যাচ্ছি হঠাৎ কে যেন আমার কোমরে খোঁচা দিল। ঘুরে দাড়াতেই বুঝতে পারলাম কোন পিচাশের কাজ এটা। পুরুষের উপর ঘেন্না চলে এলো। শাড়ী না কিনে মাথা ব্যাথার উছিলায় বাড়ি চলে এলাম।শুধু মাত্র মায়ের জন্য নয়তো বিয়ের কোন ইচ্ছেই আমার ছিল না। সারাজীবন একাই থাকার ইচ্ছে ছিল।

 

যথা সময়ে যথারিতিতে বিয়ে সম্পন্ন হলো। যাবার সময় মা অনেক কান্না করলো, আদরও করলো। আমি কাঁদতে চাচ্ছিলাম না কিন্তু মায়ের জন্য কলিজা ছিড়ে যাচ্ছিল। মাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদলাম।

তার পর চলে এলাম অন্য ভূবনে। আমাকে নিয়ে গেল উনার রুমে। খুবই অবাক হলাম যেন ফুলের রাজ্যে এসেছি। পুরা ঘরটাই ফুল দিয়ে সাজানো। আজ মনে হচ্ছে আমার একটা ইচ্ছে পূরন হলো। মনে অনেক স্বপ্ন নিয়ে ফুলের ঘরে বসলাম,  খানিক বাদেই উনি এলেন। কেন যেন একটু ভয় লজ্জা খুশি সব একসাথে কাজ করতে লাগলো। উনি এসে আমার সামনে বসলো। আমাকে দেখে বললো, এতো সেঁজেছো কেন? তুমি তো এমনি অনেক সুন্দর।

 

জ্বি! বিয়ে তো একবারই করবো বার বার তো নয় তাই না হয় একটু সাঁজলাম। আমার কথায় উনি হেসে দিল। ওহ! উনি হচ্ছেন আমার বর। নাম অর্নব আমাকে বললো, তুমি কী খুশি? আমি মাথা নেরে সহমত হলাম। তারপর অর্নব আমাকে ধরে কপালে আলতো করে আদর মেখে দিল। আজ কেন যেন ভালো লাগা থেকে ভালোবাসার জন্ম নিল। তারপর রাতটা যেন ভালোবাসার একটা মহল তৈরী হলো। যতই দিন যাচ্ছে আমাদের ভালোবাসা ততই গভীর হচ্ছে। শাশুড়ী,ননদ, দেবর সবাই খুব ভাল। মন বলে উঠলো যে শুধু খোঁচা খেয়ে আসছে তার কি এতো ভালোবাসা সইবে।

দেখতে দেখতে ২ বছরের বেশী হয়ে গেল। সবাই একই স্থানে আছে শুধু শাশুড়ীর পরিবর্তন, এতো বছর হলো নাতি নাতনীর মুখ কি দেখতে পাবো না? দিনে দিনে পরিবর্তন আরো বাড়তে লাগলো। অর্নব থাকলে কিছুই বলতো না ও চলে গেলেই শুরু হতো। অপয়া,অপয়া এনেছি ঘরে।  সব কথা সহ্য করেছি এটা সইতে পারছি না। অর্নবকে ফোন করে বললাম বাসায় তারাতারি আসো ডাঃ কাছে যাবো। ও আধ ঘন্টার মধ্যে চলে এলো। খুব অস্থির ও। কি, কি হয়েছে তোমার? বলার আগেই ফোন কেটে দিল কেন?                      এমনি, চলো। ডাঃ কাছে যাবো আমি মা হচ্ছি না কেন? তাই দুজনে চেকআপ করাবো। তোমার আপত্তি আছে কোন? দুজনই চেকআপ করালাম। রেজাল্ট দিবে দু’দিন পর।

অর্নব রিপোর্ট নিয়ে বাসায় এলো, রুমে ঢুকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল। বারবার বললাম কি হয়েছে বলো না গো কাঁদছো কেন?ওর কান্না দেখে আমিও কেঁদে ফেললাম।  তোমার কোন সমস্যা নাই ইতি। সমস্যা আমার, আমার দোষেই তুমি মা  ডাক শুনতে পাবে না। আমাকে তুমি ক্ষমা কর। প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দাও।

এসব তুমি কি বলছো আমাদের ভালোবাসা কি এতোই দূর্বল। আমাদের দুজনের ভালোবাসায় বাকি জীবন পার করে দিব।

আমার একটা অনুরোধ রাখবে অর্নব?

হুম বলো তুমি যা বলবে আমি সব শুনবো, মানবো। তাহলে সমস্যা তোমার একথা কাউকে কোনদিন বলবে না। তা হয় না। সবাই তোমাকে দোষ দিবে। দিক তাতে আমার কিছু হবে না। প্লিজ তুমি কাউকে বলোনা সোনা। যদি তোমাকে কেউ কিছু বলে তখন ছারবো না।

এভাবে কাটলো আরো দুটি বছর। শাশুড়ীর কথায় তিক্ততা জন্ম নিয়েছে মনে। শুধু অর্নবের ভালোসায় সব সহ্য করছি। অর্নবকে কিছু বলতেই পারছি না। কারন ইতি চায় না মা-ছেলের দূরুত্ব বাড়ুক। এখন শাশুড়ীর সাথে সাথে ননদ দেবরও শুরু করেছে।

আজ সব সীমা পার করেছে শাশুড়ী। অপয়া,অলক্ষী,জারজ সন্তান জন্মদিতে পারলি না তো বেঁচে আছিস কেন? মরতে পারিস না? তা না পারলে চলে যাস না কেন?

ইতি রুমে চলে গেল আজ ওর সহ্য ক্ষমতা শেষ করে ফেলেছে। বাবা মাকে নিয়ে গালি সহ্য করা যাচ্ছে না।

কি করবো, কোথায় যাবো কাকে বলবো?

অস্থির ইতি কি করবে কাউকে মনেও করতে পারছে না। ভাই বোন এমন কি অর্নবকেও না।  দু’হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে নিচে বসে পড়লো। মা মাগো বলে নিরব চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমি কি পাগল হয়ে যাবো মা? ইতি উঠে দাড়ালো। একটা কাগজে কিছু লিখে কিছু টাকা আর ব্যাগটা নিয়ে এক কাপড়ে বেড়িয়ে পরলো।

কোথায় যাবে ও নিজেও জানে না। অনেকক্ষন একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর রওনা দিল ষ্টেসনের দিকে। ট্রেনের অপেক্ষায় আছে। ট্রেন আসছে,যাচ্ছে ও উঠছে না। বসেই আছে এদিকে সন্ধা  হয়ে আসছে। ও মাথা তুললো সব যেন আঁধারে ছেয়ে গেছে। কিছু দেখতে পাচ্ছে না। একজন এসে বললো, দেখছি অনেক্ষন বসে আছেন কেউ আসবে না আপনি যাবেন?। ইতি যেন প্রান খুঁজে পেল। এরপরের ট্রেন কোথায় যাবে? লোকটা বললো রাঙামাটি। হুম আমি রাঙামাটি যাবো। তা টিকেট কেটেছেন? না! আপনি কী একটা টিকেট কেটে দেবেন? লোকটা না করলো না। ইতি ট্রেনে উঠে বসলো। আর ভাবতে থাকলো জীবনটা আমার এমন কেন হলো। কোথায় যাচ্ছি আমি? কার কাছে কেন?

অর্নব বাসায় ফিরলো, রাত ০৮ টা ইতিকে খুঁজছে। কোথাও নেই, ফোন বাসায়। মাকে জিজ্ঞেস করলো বললো জানি না। অর্নব রুমে চলে গেল কাগজটা দেখলো। তাতে লেখা ছিল-

আমার ভালোবাসা,

তোমাকে ছেরে যাবার ইচ্ছে আমার কোন দিনই ছিল না। আজ আমি অপারগ। সহ্য ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। জানি তোমার খুব কষ্ট হবে আমাকে ছারা। কষ্ট পেও তবে বেশী নয়। কান্না পাবে কেঁদো বেশী নয়। মনটা পাথর হয়ে যাবে তবুও একটু নরম থাকার চেষ্টা করো। তোমার কান্না কষ্ট আমাকেও কাঁদাবে। আমি কাঁদবো তোমার আমার স্মৃতি নিয়ে হাসবো। তোমার কথা ভেবে ভেবে পথ চলবো। আমার কিসের কষ্ট বলো। তুমি ভালো থেকো। মায়ের ইচ্ছায় বিয়ে করো। শুধু আমাকে মনের মাঝে রেখ।

-তোমার ইতি

অর্নবের বোঝার বাকি রইলো না, নিচে এসে মাকে সব খুলে বললো। সব শুনে মা শক পেলেন। এতোবড় শক সইতে পারলেন না মাটিতে লুটিয়ে পরলেন। আর উঠলেন না। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। নিঃস্পাপ মেয়েটাকে কি কষ্টটাই না দিয়েছেন—

মাকে দাফন করলো। হতাশা ক্লান্ত দেহ নিয়ে বাসায় ফিরলো। ক্লান্ত শুয়ে পড়লো। মাকে হারানোর কষ্ট মানতে পারছে না। অতিত নিয়ে ভাবছে। ভাবছে মায়ের নানা কথা। হঠাৎ মনে পড়লো ইতির কথা। মনে মনে ভাবলো আর নয় আমার ইতিকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে।

ঘরের কোনে বসে না থেকে ছুটলো ইতির খোঁজে। কোথাও পেল না। অসহায়ের মতো বাসায় ফিরলো। দুজন প্রিয় মানুষ হারিয়ে অর্নব আজ নিঃস্ব।

প্রতিদিনই ইতিকে খোঁজে অর্নব। হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরে।

দু’বছর হলো, ভাই বোন দুজনেরই বিয়ে হলো। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু অর্নব আশা ছাড়েনি।

৫বছর পর ইতি তার বোনকে ফোন করলো। শুধু বললো আমি ভালো আছিরে আপু। বলেই ফোন কেটে দিল। সুচনা ট্রাই করলো বার বার ফোন ধরলো না ইতি।

সূচনা অর্নবকে সব বললো ইতির নাম্বারটাও দিল। ফোনের মাধ্যমে জানতে পারলো ইতি কোথায় আছে। অর্নব বের হলো ইতির খোঁজে।

ইতি ছোট্ট একটা কুটিরে থাকে একটা পরিবারের সাথে। আর স্কুলে পড়ায়।

ফোনের মাধ্যমে খোঁজ পেল ইতি কোথায় থাকে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরও ইতিকে খুঁজে পাচ্ছে না।ইতির কথা জানতে চাইলে সবাই বলে, এই নামে কাউকে চিনি না। ইতি এখানে নাম বদলে ফেলেছে।

 

অর্নব তাঁর প্রান খুঁজে পেল। সাদা শাড়ী কাঁধে ব্যাগ মাথা নিচু করে আনমনে হেঁটে চলেছে। অর্নব তাঁকিয়ে চোখের জল ফেলছে। ইতির খুব কাছাকাছি। ইতি টের পেল সামনে কেউ দাড়িয়ে আছে পাশ কেটে যেতে লাগলো। অর্নব হাত ধরে বসলো।

আর কতো কষ্ট দিবে আমায়, ইতি চোখ তুলে তাঁকালো অনর্বের দিকে। বাক রুদ্ধ ইতি। দু’জনের চোখ বেয়ে দুর্ভেদ্য রহস্য টপ টপ করে ঝরে পরছে। চোখ যেন কুল হারায় হারায় অবস্থা। কারর কোন কথা নেই।

ইতি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলতে লাগলো তোমার বউ কই?

এইতো আমার সামনে

অর্নবকে জড়িয়ে ধরলো।

অর্নব-চলো ফিরে যাই।

ইতি- থাকনা, আমার সাথে ঐ ছোট্ট কুটিরে। বাকি জীবন এখানেই কাটাই। ভালোবসার ছোট্ট কুটির।

আমার কুটিরও যে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে গো।

তুমি আসবে বলে সুন্দর করে সাঁজিয়েছি ভালোবাসা দিয়ে।

 

অারো খবর